1. admin@www.shikhatvlive.com : news :
বৃহস্পতিবার, ১৯ মে ২০২২, ০৮:৩২ পূর্বাহ্ন

এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বদলি না থাকায় শিক্ষকরা পদে পদে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

প্রতিবেদকের নাম:
  • প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২২ ফেব্রুয়ারী, ২০২২
  • ৩৪ ,৫২৫০ বার পড়া হয়েছে

 

নীতিমালায় থাকলেও কার্যকর নয়
পাঁচ লাখ বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীর বদলির সুযোগ নেই

পাঁচ লাখ বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীর বদলির সুযোগ নেই

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার ঠুল্লাকান্দি গ্রামের নাজির হোসেন বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক। ২০১৬ সালে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের দেওয়া প্রথম গণবিজ্ঞপ্তি অনুসারে আবেদন করে পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পেয়েছিলেন তিনি। কাজে যোগ দিয়েছিলেন বাড়ি থেকে ৩৫০ কিলোমিটার দূরে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার চন্দ্রাছড়ি এসইএসডিপি উচ্চ বিদ্যালয়ে। তারপর পাঁচ বছর পেরোতে চলল- এমপিও নীতিমালায় থাকলেও কার্যকর না করায় তিনি বদলির সুযোগ পাচ্ছেন না।

সহকারী শিক্ষক হিসেবে নাজির হোসেনের বেতন মাত্র সাড়ে ১২ হাজার টাকা। তার স্ত্রী ও দুই সন্তান থাকেন গ্রামের বাড়িতে। এই টাকায় তিনি নিজের খরচ ও পরিবারের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। সমকালের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে স্বচ্ছতার সঙ্গে মেধার ভিত্তিতে চাকরিতে এসেছিলাম। স্বল্প এ বেতনে তাও চলতে পারতাম, যদি নিজের উপজেলায় বদলি হয়ে যেতে পারতাম। এমপিওভুক্তির নীতিমালায় বদলির সুযোগ আছে। কিন্তু সরকার এখনও তা কার্যকর না করায় এই সুবিধা মিলছে না। অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে তিনি বলেন, গেল ১৫ নভেম্বর আমার নানি মারা গেছেন। তার জানাজাতেও যেতে পারিনি। অবুঝ দুই শিশুসন্তান পথ চেয়ে থাকে।

নাজির হোসেনের মতো সারাদেশের এমপিওভুক্ত ৫ লাখ বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী বুকে বয়ে বেড়াচ্ছেন এমনই বোবা কান্না। চাকরির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত থাকেন তারা। ক্ষেত্র বিশেষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি, সদস্য কিংবা প্রতিষ্ঠান প্রধানের হাতে হয়রানি, লাঞ্ছনা ও নিপীড়নের শিকারও হতে হয় তাদের। কথা না শুনলে চাকরিচ্যুতির শিকারও হন কেউ কেউ। অথচ বদলি পদ্ধতি চালু থাকলে তারা মানসিক ও প্রশাসনিক হয়রানির হাত থেকে রেহাই পেতেন।

অনুসন্ধানে নেমে এমন অন্তত অর্ধশত শিক্ষকের সঙ্গে কথা হয় সমকালের। তাদের কাউকে কাউকে নিজের বাড়ি থেকে ৭০০-৮০০ কিলোমিটার দূরে চাকরি করতে হচ্ছে। নীলফামারীর জলঢাকার বাসিন্দা নাহিদ পারভেজ ২০১৯ সালে এনটিআরসিএর মাধ্যমে যোগ দিয়েছেন কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার নয়াপাড়া আলহাজ্জ্ব নবী হোসেন উচ্চ

বিদ্যালয়ের কৃষিশিক্ষা শিক্ষক হিসেবে। তিনি বলেন, আক্ষরিক অর্থেই আমার বাড়ি আর কর্মস্থল অনেকটাই টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার দূরত্বে। আমার বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব ৯৮০ কিলোমিটার। ছুটিছাটাও খুব একটা মেলে না। আবার মিললেও আর্থিক টানাপোড়েনে যাওয়া হয় না। সন্তান অসুস্থ থাকলেও দেখতে যেতে পারি না। বেকারত্বের এই যুগে চাকরিও ছাড়তে পারি না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নারী শিক্ষিকা জানান, উত্তরাঞ্চলের একটি জেলার এমন এক স্থানে তিনি চাকরি করেন, যেখানে বাসা ভাড়া করে থাকার মতো পরিবেশ নেই। আবার একজন নারীর পক্ষে সেখানে একা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকাও নিরাপদ নয়। বাধ্য হয়ে কাছাকাছি শহরে থাকতে হয়। এতে যাতায়াত ও খাওয়া খরচ বাবদ তার বেতনের সব টাকা শেষ হয়ে যায়। এর ওপর রয়েছে বিভিন্ন অজুহাতে প্রধান শিক্ষকের চাঁদাবাজি। দূরে থেকে আসার কারণে কখনও দেরি হওয়ার অজুহাত কাজে লাগিয়ে মানসিকভাবে প্রচণ্ড চাপে রাখেন তিনি।

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী থেকে ৭৫০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার মিরুখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং কলেজে চাকরি করছেন ভৌতবিজ্ঞানের শিক্ষক আবদুর রাজ্জাক। সমকালকে তিনি বলেন, এই এলাকার পানি লবণাক্ত- এখানকার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছি না কিছুতেই। নিজের বাড়িতে মা-বাবাকেও কিছু দিতে পারছি না। এতদূর থেকে যাওয়া-আসা কষ্টকর, গাড়ি ভাড়া বাবদ চলে যায় প্রায় ৩৫০০ টাকা। বাসা ভাড়া ৪০০০ টাকা। গ্যাস ও বিদ্যুতের বিল দিতে হয়। হাত খরচ ছাড়াও পোশাক, খাওয়াসহ সবকিছু কিনতে হয়। অথচ বেতন তো সাড়ে ১২ হাজার টাকা মাত্র। এ টাকায় কি জীবন চলে? নিজের এলাকায় বদলি হতে পারলে অন্তত বাড়ি ভাড়া বাঁচত।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের দূরবর্তী নাচোল উপজেলার সূর্যপুর গ্রাম থেকে ৭০০ কিলোমিটার দূরে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার চন্দ্রাছড়ি এসইএসডিপি উচ্চ বিদ্যালয়ে গণিত বিষয়ে শিক্ষকতা করছেন ইমাম হোসেন। তিনি জানান, বাড়িতে মা গুরুতর অসুস্থ। ওয়াশ রুমে একা একা যেতে পর্যন্ত পারেন না। মা অনেক সময় কাঁদতে কাঁদতে বলেন, বাবা ইমাম, আমি মনে হয় তোর মুখ দেখে মরতে পারব না। এ কেমন ভাগ্য আমার? শিক্ষকদের এ রকম চিন্তায় জর্জরিত রেখে বিশ্বমানের শিক্ষাদান কি কখনও সম্ভব?

গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার ঘোড়াবান্ধা গ্রামের কাজী আমজাদ হোসেন কৃষিশিক্ষার শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা করছেন ফেনী সদরের ধুনসাহার্দ্দা উচ্চ বিদ্যালয়ে। আমজাদ জানান, দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রায় ৯৭ ভাগ অবদান বেসরকারি শিক্ষা খাতের। সিংহভাগ শিক্ষক বেসরকারি। অথচ তারা নানা রকম সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। নেই প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন বা ঐচ্ছিক বদলির সুবিধা।

শিক্ষকরা জানান, বদলি প্রথা না থাকায় একই প্রতিষ্ঠানে অনেক বছর চাকরি করায় একঘেয়েমি চলে আসে, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের স্পৃহা কমে আসে, স্থানীয় শিক্ষকদের প্রভাববলয় ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির খবরদারিতার প্রভাব পড়ে প্রত্যেক শিক্ষকের ওপর।

প্রসঙ্গত, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তি ও জনবল কাঠামো নীতিমালা ১৯৯৫, ২০০৫, ২০১০, ২০১৮ ও সর্বশেষ ২০২১ সালের নীতিমালায়ও বেসরকারি বদলির বিধান রাখা আছে। অথচ তা কার্যকর করার ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একেবারে উদাসীন। শিক্ষকরা জানান, ২০১৫ সালের আগে এনটিআরসিএ নিয়োগের আগে একজন বেসরকারি শিক্ষক কমিটির পরীক্ষার মাধ্যমে উত্তীর্ণ হয়ে নিয়োগ পেতেন। এভাবে একজন শিক্ষক প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সুযোগ পেতেন। এনটিআরসিএর নিয়োগ চালুর ফলে সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে।

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ ডেল্টা ডিগ্রি কলেজের কৃষিশিক্ষার প্রভাষক কায়েদে আজম জয় বলেন, নিজের জেলা সিরাজগঞ্জ থেকে ২৫০ কিলোমিটার দূরে লক্ষ্মীপুর জেলায় চাকরি করতে এসেছি। নিজে রান্না করে খেতে হয়। অনেক সময় স্থানীয় কোনো কোনো শিক্ষক এবং কর্মচারীরা দূরের শিক্ষকদের বিভিন্নভাবে লাঞ্ছিত করেন। যখন চাকরিতে যোগ দেই, তখন ভেবেছিলাম পরিবর্তন আসবে। হয়তো বদলি চালু হবে। কিন্তু সে ভাবনা ভাবনাই রয়ে গেল আজও।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) উপপরিচালক এনামুল হক হাওলাদার বলেন, ২০২১ সালের এমপিও নীতিমালায় বলা আছে, বেসরকারি শিক্ষকদের বদলির বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। এ বিষয়ে এখনও কোনো উদ্যোগ নেই। নীতিমালা প্রণীত হলে ও সরকার কর্তৃক গৃহীত হলে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের বদলি কার্যক্রম শুরু হবে

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

আরো সংবাদ পড়ুন

ওয়েবসাইট নকশা প্রযুক্তি সহায়তায়: ইয়োলো হোস্ট

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত